Home / BCS TIPS / বিসিএস পরীক্ষা–পদ্ধতি সংস্কার–ভাবনা

বিসিএস পরীক্ষা–পদ্ধতি সংস্কার–ভাবনা

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষায় বড় ধরনের সংস্কারের একটি প্রস্তাবের প্রক্রিয়া করা হচ্ছে। আর স্বাভাবিকভাবেই প্রস্তাবটি সূচনা করছে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি)। খবরের উৎস হিসেবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুজন সদস্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। খবরে সংযোজিত হয়েছে পিএসসির চেয়ারম্যানের কিছু বক্তব্য। উদ্দেশ্য, দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষা–পদ্ধতি পাল্টে স্বল্পমেয়াদি করা। লিখিত পরীক্ষার মূল্যায়নে স্বচ্ছতা আনার জন্য দুজন পরীক্ষককে নিয়ে পিএসসিতে বসেই খাতা দেখা, প্রশাসনে ইংরেজি জানা কর্মকর্তার স্বল্পতা দূর করার জন্য বাংলার পরিবর্তে ইংরেজির ওপর জোর দেওয়া ইত্যাদি থাকছে প্রস্তাবটিতে। সংস্থার আর্থিক স্বাধীনতা ও পরীক্ষা গ্রহণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মানীর হার বাড়ানোর মতো প্রশাসনিক বিষয়াদিও এতে উল্লেখ রয়েছে। এগুলোর সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করার কোনো কারণ নেই। আর পরীক্ষার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা দূর করার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কারও ভিন্নমত থাকতে পারে না।

প্রকৃতপক্ষে প্রতিবছর বিসিএস পরীক্ষা হওয়া উচিত। আর পিএসসির কার্যক্রম ছাড়াও স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চরিত্রগত প্রতিবেদনসহ সব সম্পূর্ণ করে সে বছরের মধ্যে নিয়োগও চূড়ান্ত হওয়া উচিত। কর্মকর্তাদের ইংরেজি ভাষাজ্ঞানের দৈন্য দূর করতে পিএসসির উদ্যোগ সমর্থনযোগ্য। কেননা, এ উন্মুক্ত বিশ্বে যোগাযোগে মূল ভূমিকায় থাকার জন্য ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি প্রযুক্তির কথাও বিবেচনা করা যায়। তবে পরীক্ষার নম্বর কমানো, পিএসসিতে বসে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে ভাবনা ও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।

বিসিএসসহ সব ধরনের নিয়োগের জন্য পরীক্ষা নেওয়া হয় পরীক্ষার্থীদের মেধা যাচাইয়ের জন্য। আর প্রার্থীদের প্রতি সুবিচার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে দক্ষ কর্মকর্তার জোগান দিতে মেধাই মানদণ্ড হওয়া সংগত। তবে একটি রাষ্ট্রের অনেক ধরনের রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা থাকে। তাই সরকারি নিয়োগে আমাদের মতো দেশে চালু রয়েছে প্রাধিকার কোটা। মেধার জন্য মাত্র ৪৫ শতাংশ। কোটা সম্পর্কে বিতর্ক না থাকলেও এর অযৌক্তিক পরিমাণ নিয়ে জোরালো মতান্তর আছে আমাদের সমাজে। পিএসসির সংস্কার প্রস্তাবে এটার উল্লেখ আছে কি না, সে খবরে তার উল্লেখ নেই। প্রসঙ্গত বলা চলে, সরকার জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলপত্রে মেধা কোটা যৌক্তিক পরিমাণে বৃদ্ধিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

উল্লেখ্য, পরীক্ষার ফলাফলই মেধা যাচাইয়ের কোনো নির্ভুল পদ্ধতি নয়। তবু ভিন্ন কোনো মানদণ্ড এখন পর্যন্ত নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। প্রশ্ন হচ্ছে, বিসিএস পরীক্ষা কত নম্বরের হবে, আর কী কী বিষয় এতে অন্তর্ভুক্ত হওয়া সংগত? এ দিকটি দেখতে গেলে আমাদের সিভিল সার্ভিসে উত্তরাধিকার আর একই বৈশিষ্ট্যের অধিকারী অন্য দুটো দেশ ভারত ও পাকিস্তানের ব্যবস্থা দেখা সংগত। আর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চরিত্রগত প্রতিবেদন সংগ্রহ কমিশন নিয়ন্ত্রণ করে না। এটার দায়িত্ব সরকারের ভিন্ন সংস্থার। অবশ্য সামগ্রিক দায়িত্বে থাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। দেখা যাচ্ছে, পিএসসির সুপারিশ পাওয়ার পরও স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চরিত্রগত প্রতিবেদন সম্পন্ন করে নিয়োগ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে প্রায় ক্ষেত্রে ছয় মাস কিংবা তার চেয়েও বেশি সময় লাগছে। অথচ ব্যাপারটি সর্বোচ্চ দুই মাসে করা সম্ভব এবং নিকট অতীতেই তা হয়েছে। আর সে ব্যবস্থা নিতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা নেওয়া আবশ্যক। সেই বিবেচনায় পিএসসি ১০ মাস সময় পাবে। এর মধ্যে তাদের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, আবেদনপত্র গ্রহণ ও বাছাই, প্রিলিমিনারি পরীক্ষা গ্রহণ ও ফল প্রকাশ, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে সুপারিশ চূড়ান্ত করতে হবে। এ পর্যায়ে আলোচনা করা যেতে পারে এগুলো করতে সিলেবাস সংক্ষিপ্ত করে লিখিত পরীক্ষা ৫০০ নম্বরে আনার প্রস্তাবের যৌক্তিকতা। এখন পিএসসি ২০০ নম্বরের প্রিলিমিনারি পরীক্ষার পর লিখিত পর্যায়ে বাংলা, ইংরেজি, বাংলাদেশ বিষয়াবলি বিষয়ে ২০০ নম্বর করে আর আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি, গাণিতিক যুক্তি ও সাধারণ বিজ্ঞান বিষয়ে ১০০ নম্বর করে মোট ৯০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা নেয়। এটা সাধারণ ক্যাডারের জন্য প্রযোজ্য। বিশেষায়িত ক্যাডারে কিছুটা ভিন্ন। ভারতে প্রিলিমিনারিতে ৪০০ নম্বরের পরীক্ষা হয়। লিখিত পরীক্ষা ১৭৫০ নম্বরের। এতে ১৮টি সরকারি ভাষার যেকোনো একটি এবং সাধারণ ইংরেজিতে ৩০০ নম্বর করে পরীক্ষা দিতে হয়। আরও আছে ইংরেজি রচনায় ২৫০ নম্বর। আছে কিছু আবশ্যিক ও ঐচ্ছিক বিষয়। মৌখিক পরীক্ষা ২৭৫ নম্বরের। পাকিস্তানের পরীক্ষার ধরনও অনেকটা তা-ই।

আবশ্যিক ও ঐচ্ছিক মিলে আর মৌখিক পরীক্ষা মিলে ৩০০ নম্বর। তারা বছরের পরীক্ষা বছরেই শেষ করতে পারলে আমাদের না পারার কোনো কারণ নেই। তবে আমাদের দেশের মৌখিক পরীক্ষার নম্বরে অনুরাগ-বিরাগের অভিযোগ রয়েছে বিধায় এটা ১০০ নম্বরে হ্রাস করে ইংরেজিতে বাড়ানো যায়। সে ক্ষেত্রে ইংরেজি পরীক্ষা হবে ৩০০ নম্বরের। আর হাজার হাজার পরীক্ষার্থীকে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় ডাকারও আবশ্যকতা নেই। ভারতের দৃষ্টান্ত অনুসরণে এখানে শূন্যপদের ১০ গুণ প্রিলিমিনারি থেকে লিখিত পরীক্ষায় ডাকা যায়। তেমনি লিখিত পরীক্ষা থেকে প্রতি পদের বিপরীতে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা যায় দুজনকে। এতে বেশি নম্বরের পরীক্ষাও অনেক কম সময়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা চলে। তা না করে পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে দিলে মেধা যাচাই যথার্থ হবে না বলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন। শুধু মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে কিংবা কম নম্বরে পরীক্ষা নিয়ে এ দেশে বিসিএসে অতীতে নিয়োগ দেওয়া বিতর্কিত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে বেশ কিছু মেধাবীও ছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা যায়নি তাঁদের। তাই বিসিএস পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে আনলে মান হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।খাতা দেখার যে প্রক্রিয়াটির কথা কমিশন ভাবছে, তাতে সংশয় সৃষ্টি হবে। দুই পরীক্ষক থাকার বিষয়টির প্রয়োজনীয়তা ভেবে দেখা যায়। তবে সময় অনেক বেশি নেবে। সেটার নজির প্রতিবেশী দেশগুলোতে আছে কি না, আমাদের জানা নেই। থাকুক আর না-থাকুক, বছরের পরীক্ষা বছরে শেষ করা নিশ্চিত করা গেলে এটি নিয়ে তেমন বিতর্ক হবে না। তবে বিতর্ক হবে কমিশনে বসে খাতা দেখার ব্যবস্থা নিয়ে। এতে চাকরিরত, মর্যাদাসম্পন্ন মেধাবী পরীক্ষক খাতা দেখতে সুস্পষ্টভাবে অনিচ্ছুক হবেন। ইংরেজি ভাষার ওপর জোর দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে সে বিষয়ে ১০০ নম্বর বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলা ভাষা বাদে অন্য বিষয়গুলোর প্রশ্ন ও উত্তর শুধু ইংরেজিতে নেওয়া বাধ্যতামূলক করা যায় কি না, এটার আইনগত দিক কমিশন খতিয়ে দেখতে পারে। একজনের মৌখিক পরীক্ষা সাধারণত ১৫-২০ মিনিট স্থায়ী হয়। এর অন্তত অর্ধেকের বেশি সময় ইংরেজিতে প্রশ্নোত্তরের ব্যবস্থাও নেওয়া যায়। তবে উভয় ক্ষেত্রে সামর্থ্যের সংকট দেখা দিতে পারে।

এ দেশে মাতুলবিহীন ব্যক্তিদের চাকরিপ্রাপ্তির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান পিএসসি। তাদের ভুলভ্রান্তি কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনুরাগ-বিরাগের অভিযোগও আছে। তবে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত চাকরিপ্রার্থীদের জন্য এর চেয়ে নিরাপদ কোনো প্রতিষ্ঠান নেই দীর্ঘসূত্রতার কুফলের আরেকটি নজির নন-ক্যাডার পদে নিয়োগ নিয়ে। সরকার যখন বিসিএসে উত্তীর্ণদের থেকে ক্যাডারে যাঁরা চাকরি পাবেন না, যতজনকে সম্ভব নন-ক্যাডার পদে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তখন এখানে বিলম্ব করা অযৌক্তিক। ব্যবস্থাটি ভালো ও সমর্থনযোগ্য। সরকারের জনবল দরকার। আর দক্ষ জনবল রয়েছে পিএসসির তালিকায়। তাই পরীক্ষা শুরুর আগে মন্ত্রণালয়গুলোর চাহিদা নিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নন-ক্যাডার সম্পর্কেও পিএসসিকে জানাতে পারে। আর ক্যাডার পদে নিয়োগ প্রস্তাব চূড়ান্ত করার পাশাপাশি কিংবা পরপরই সেটা চূড়ান্ত করা হলে ভোগান্তি কমবে অনেক।

এ দেশে মাতুলবিহীন ব্যক্তিদের চাকরিপ্রাপ্তির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান পিএসসি। তাদের ভুলভ্রান্তি কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনুরাগ-বিরাগের অভিযোগও আছে। তবে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত চাকরিপ্রার্থীদের জন্য এর চেয়ে নিরাপদ কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। মেধাকে প্রাধান্য দেওয়া যেমন তাদের মৌলিক উদ্দেশ্য, তা করতে মেধা কোটার বৃদ্ধির জন্যও পিএসসি সোচ্চার হতে পারে। উল্লেখ্য, এ মেধাভিত্তিক সিভিল সার্ভিস উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনেরই ধারাবাহিকতা। তারা পঞ্চদশ ও ষষ্ঠদশ শতাব্দীর দিকে এটি ধার করে চীন থেকে। চীনে ত্রয়োদশ শতাব্দীতেই রাজা বা কোনো অমাত্যের সুপারিশ নয়, মেধাভিত্তিক সিভিল সার্ভিসের সূচনা হয়। নব্য কনফুসিয়ান ঘরানার এ জ্ঞানী কর্মকর্তারা বিশাল চীন সাম্রাজ্যের ভিত্তিই শুধু ধরে রাখেননি, অবদান রেখেছেন শিক্ষা-সংস্কৃতিসহ শিল্প–বাণিজ্যের প্রসারে। তাঁরা ক্রমে নজরে পড়েন ইউরোপের। আর সে সুবাদেই আমরা এটাকে পেয়েছি। যুগের প্রয়োজনে এর আকৃতি ও প্রকৃতিতে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধাকে প্রাধান্য দেওয়ার মৌলিক নীতিটি নিশ্চয়ই অপরিবর্তিত থাকবে।

সুত্র: প্রথম আলো

Check Also

bcs_8069

৩৬, ৩৭ ও ৩৮ তম বিসিএস পরীক্ষার্থীর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ন নোটিশ প্রকাশ

৩৬, ৩৭ ও ৩৮ তম বিসিএস পরীক্ষার্থীর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ন নোটিশ প্রকাশ বিসিএস বুলেটিন ১। …

Leave a Reply

Your email address will not be published.